শফিকুল হক চৌধুরী

শফিকুল হক চৌধুরী: আশা (ASA)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও হবিগঞ্জের কৃতি সন্তান

প্রতিষ্ঠাতা, আশা (ASA) ও সাবেক উপদেষ্টা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার

ভূমিকা ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

বাংলাদেশের বেসরকারি উন্নয়ন খাত ও ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের ইতিহাসে মো. শফিকুল হক চৌধুরী এক অবিসংবাদিত নাম। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং ব্যয়সাশ্রয়ী আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করেছেন। তিনি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা ‘আশা’ (Association for Social Advancement)-এর প্রতিষ্ঠাতা। হবিগঞ্জের মাটির এই কৃতি সন্তান বিসিএস ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও সরকারি চাকরির লোভ ত্যাগ করে গ্রামীণ উন্নয়নে জীবন উৎসর্গ করেন এবং পরবর্তীতে ২০০৬ সালে বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেন।

এক নজরে মূল তথ্য

  • পূর্ণ নাম: মো. শফিকুল হক চৌধুরী
  • জন্ম: ১ জানুয়ারি ১৯৪৯
  • জন্মস্থান: দক্ষিণ নরপতি গ্রাম, চুনারুঘাট উপজেলা, হবিগঞ্জ জেলা
  • পিতা: আবুল হোসেন নোমান চৌধুরী (চুনারুঘাট ইউপির প্রথম চেয়ারম্যান)
  • শিক্ষা: মাধ্যমিক (বৃন্দাবন সরকারি উচ্চবিদ্যালয়), উচ্চমাধ্যমিক (বৃন্দাবন সরকারি কলেজ), বিএসএস (সম্মান, ১৯৬৮) ও এমএসএস (সমাজবিজ্ঞান, ১৯৬৯), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
  • প্রথম কর্মস্থল: বার্ড (তৎকালীন PARD, কুমিল্লা) ও সিসিডিবি (CCDB)
  • প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান: আশা (ASA), আশা ইন্টারন্যাশনাল, আশা ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, আশা ম্যাটস, হোপ ফর দ্য পুওরেস্ট (HP)
  • রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব: উপদেষ্টা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার (২০০৬–২০০৭)
  • মৃত্যু: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২১ (ঢাকায়)

জন্ম, পারিবারিক পরিচয় ও শিক্ষাজীবন

মো. শফিকুল হক চৌধুরী ১৯৪৯ সালের ১ জানুয়ারি তৎকালীন সিলেট জেলার হবিগঞ্জ মহকুমার চুনারুঘাট উপজেলার দক্ষিণ নরপতি গ্রামের এক ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আবুল হোসেন নোমান চৌধুরী ছিলেন চুনারুঘাট ইউনিয়ন পরিষদের প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান।

তিনি হবিগঞ্জের স্বনামধন্য বৃন্দাবন সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং বৃন্দাবন সরকারি কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৬৮ সালে তিনি স্নাতক (সম্মান) এবং ১৯৬৯ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে প্রগতিশীল রাজনীতি ও সামাজিক সংস্কারমূলক চিন্তাধারা তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা করে।

কর্মজীবনের সূচনা ও আদর্শিক সিদ্ধান্ত

শিক্ষাজীবন শেষ করে ১৯৬৯ সালে তিনি তৎকালীন পাকিস্তান একাডেমি ফর রুরাল ডেভেলপমেন্টে (PARD, বর্তমান বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি বা বার্ড) যোগ দেন। সেখানে কাজ করার মাধ্যমে তিনি গ্রামীণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, দারিদ্র্য ও উন্নয়ন কাঠামোর বাস্তব সমস্যাগুলো প্রত্যক্ষভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।

পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালে তিনি খ্রিষ্টান কমিশন ফর ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ (CCDB)-এর সঙ্গে যুক্ত হন। একই বছর তিনি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তবে নিশ্চিত সরকারি আমলাতান্ত্রিক ক্যারিয়ারের বদলে সাধারণ ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের আর্থ-সামাজিক মুক্তির পথকেই তিনি বেছে নেন।

“বিদেশি অনুদানের ওপর চিরকাল নির্ভর না করে নিজস্ব শক্তিতে দাঁড়ানোই আত্মমর্যাদাশীল দারিদ্র্য বিমোচনের মূল চাবিকাঠি।” — শফিকুল হক চৌধুরী

‘আশা’ প্রতিষ্ঠা ও ঐতিহাসিক রূপান্তর

  • তেপরা গ্রামে সূচনা (১৯৭৮): ১৯৭৮ সালে মানিকগঞ্জের তেপরা গ্রামে সমমনা কয়েকজন তরুণকে সাথে নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘Association for Social Advancement’ (ASA)। শুরুর দিকে আশা গ্রামীণ অধিকার সচেতনতা, আইনি সহায়তা, গণশিক্ষা ও প্রান্তিক মানুষকে সংগঠিত করার কাজে মনোযোগ দেয়।
  • ক্ষুদ্রঋণে ঐতিহাসিক রূপান্তর (১৯৯১): নব্বইয়ের দশকের শুরুতে তিনি অনুভব করেন যে প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক ভিত্তি ছাড়া কেবল সামাজিক সচেতনতা দিয়ে স্থায়ী দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব নয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯১ সালে আশাকে বিশেষায়িত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হয়।
  • ব্যয়সাশ্রয়ী ‘আশা মডেল’: তিনি জটিল নিয়মকানুন পরিহার করে ন্যূনতম প্রশাসনিক খরচ, একক ব্যক্তিভিত্তিক ঋণ ব্যবস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বনির্ভরতার ওপর ভিত্তি করে একটি স্বতন্ত্র পরিচালন কাঠামো গড়ে তোলেন, যা বিশ্বজুড়ে ‘আশা মডেল’ নামে পরিচিতি পায়।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল ও অন্যান্য উদ্যোগ

  • আশা ইন্টারন্যাশনাল: ২০০৬ সালে তিনি ক্যাটালিস্ট মাইক্রোফাইন্যান্স ইনভেস্টরস প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন এবং ২০০৭ সালে ডির্ক ব্রাউয়ারের সাথে মিলে প্রতিষ্ঠা করেন ‘আশা ইন্টারন্যাশনাল’। এর মাধ্যমে এশিয়া ও আফ্রিকার একাধিক দেশে আশার আর্থিক অন্তর্ভুক্তি মডেল বিস্তার লাভ করে।
  • ফোর্বস স্বীকৃতি (২০০৭): মার্কিন বিখ্যাত সাময়িকী ফোর্বস আশাকে ব্যয়সাশ্রয়ী ও অত্যন্ত টেকসই একটি সফল ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
  • শিক্ষা ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান: সাধারণ মানুষের উচ্চশিক্ষার সুবিধার্থে ঢাকায় ‘আশা ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ’, চিকিৎসা সহকারী গড়ে তুলতে ‘আশা ম্যাটস’ এবং অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ‘হোপ ফর দ্য পুওরেস্ট’ (HP) গড়ে তোলেন।

রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও প্রয়াণ

২০০৬–২০০৭ মেয়াদে তিনি রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের নেতৃত্বাধীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কৃষি, যুব ও ক্রীড়া এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০২১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় চিকিৎসারত অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আত্মপ্রচারবিমুখ এই কর্মবীর তাঁর কর্মের মধ্য দিয়ে আজীবন বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষের অর্থনৈতিক আত্মমর্যাদার প্রতীক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

তথ্যসূত্র

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *