মেজর জেনারেল এম. এ. রব

মেজর জেনারেল এম. এ. রব, বীর উত্তম (১৯১৯ – ১৯৭৫)

মুক্তিযুদ্ধের চিফ অব স্টাফ, গণপরিষদ সদস্য ও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সেনাপ্রধান

ভূমিকা ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আবদুর রব (এম. এ. রব) ছিলেন বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শীর্ষ সামরিক সংগঠক ও রণকৌশলী। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তিনি বাংলাদেশ ফোর্সেসের প্রথম চিফ অব স্টাফ (Chief of Staff) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানীর পরেই ছিল তাঁর সামরিক নেতৃত্ব। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ের এই কৃতি সন্তান সামরিক নেতৃত্বের পাশাপাশি ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (পরবর্তীতে গণপরিষদ সদস্য) নির্বাচিত হয়েছিলেন।

এক নজরে মূল তথ্য

ক্ষেত্রবিবরণ
পূর্ণ নামমোহাম্মদ আবদুর রব (এম. এ. রব)
জন্ম১ জানুয়ারি ১৯১৯
জন্মস্থানগ্রাম: কুর্শা, উপজেলা: বানিয়াচং, জেলা: হবিগঞ্জ (তৎকালীন সিলেট মহকুমা)
বীরত্বসূচক খেতাববীর উত্তম (১৯৭৩)
শিক্ষাগত যোগ্যতাবিএ (সম্মান), আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়
সামরিক বাহিনীব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনী, পাকিস্তান সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী
মুক্তিযুদ্ধে পদবিচিফ অব স্টাফ (বাংলাদেশ ফোর্সেস)
স্বাধীনতার পর দায়িত্বপ্রথম সেনাপ্রধান (চিফ অব আর্মি স্টাফ), বাংলাদেশ সেনাবাহিনী
রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাসদস্য, পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ (১৯৭০); সদস্য, বাংলাদেশ গণপরিষদ (১৯৭২)
মৃত্যু১৪ নভেম্বর ১৯৭৫

প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা

মোহাম্মদ আবদুর রব ১৯১৯ সালের ১ জানুয়ারি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের আসাম প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত বৃহত্তর সিলেটের হবিগঞ্জ মহকুমার বানিয়াচং উপজেলার কুর্শা খাগাউড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

তিনি স্থানীয় বিদ্যালয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর ভারতের ঐতিহ্যবাহী আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং সেখান থেকে কৃতিত্বের সাথে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি অর্জন করেন।

সামরিক জীবনের সূচনা

  • ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনী: উচ্চশিক্ষা সমাপ্তির পর তিনি ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মকর্তা হিসেবে কমিশন্ড লাভ করেন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করেন।
  • পাকিস্তান সেনাবাহিনী: ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। সেখানে তিনি বিভিন্ন সামরিক কমান্ড ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোতে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬০-এর দশকে লেফটেনেন্ট কর্নেল পদমর্যাদায় পৌঁছে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

রাজনীতি ও গণপরিষদ (১৯৭০)

সামরিক জীবন থেকে অবসরের পর তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ১৯৭০ সালের পাকিস্তানের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বানিয়াচং-আজমিরীগঞ্জ আসন থেকে বিপুল ভোটে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের (MNA) সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশ গণপরিষদের সদস্য হন।

মহান মুক্তিযুদ্ধে ঐতিহাসিক ভূমিকা (১৯৭১)

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর বর্বরোচিত হামলা চালালে এম. এ. রব মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব দিতে সীমান্ত অতিক্রম করেন।

  • তেলিয়াপাড়া বৈঠক (৪ এপ্রিল ১৯৭১): হবিগঞ্জের মাধবপুরের তেলিয়াপাড়া চা বাগান ডাকবাংলোয় মুক্তিবাহিনীর শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের ঐতিহাসিক প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে এম. এ. জি. ওসমানী, মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর কে এম শফিউল্লাহসহ অন্যান্য সিনিয়র কর্মকর্তাদের সাথে তিনিও পুরো মুক্তিযুদ্ধের অঞ্চলভিত্তিক সামরিক পরিকল্পনা প্রণয়নে নেতৃত্ব দেন।
  • চিফ অব স্টাফের দায়িত্ব: ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে ১১ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে সশস্ত্র বাহিনীর হাই কমান্ড সাজানো হয়। এতে এম. এ. জি. ওসমানীকে প্রধান সেনাপতি এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম. এ. রবকে মুক্তিযুদ্ধের ‘চিফ অব স্টাফ’ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
  • রণকৌশল ও সমন্বয়: ১১টি সেক্টরের সামরিক সমন্বয়, অস্ত্র সরবরাহ, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ এবং ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সাথে যৌথ কমান্ড গঠনের ক্ষেত্রে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
  • সম্মুখযুদ্ধে আহত: ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসের শেষের দিকে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে সেক্টরগুলোর অগ্রবর্তী অবস্থান পরিদর্শনকালে পাকিস্তানি বাহিনীর আকস্মিক বিমান হামলায় গুরুতর আহত হন এবং প্রাথমিক চিকিৎসার পর পুনরায় রণকৌশল পরিচালনায় যোগ দেন।

স্বাধীন বাংলাদেশে অবদান ও বীরত্ব খেতাব

  • প্রথম সেনাপ্রধান: বিজয়ের পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে পুনর্গঠিত হলে তাঁকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর প্রথম চিফ অব আর্মি স্টাফ (সেনাপ্রধান) হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করা হয় (পরবর্তীতে তিনি ১৯৭২ সালের এপ্রিলে জেনারেল কে এম শফিউল্লাহর কাছে এই দায়িত্ব হস্তান্তর করে অবসরে যান)।
  • বীর উত্তম খেতাব: মহান মুক্তিযুদ্ধে অনন্য রণকৌশলগত নেতৃত্ব ও সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৩ সালে তাঁকে রাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক খেতাব ‘বীর উত্তম’-এ ভূষিত করে।

জীবনাবসান ও উত্তরাধিকার

মেজর জেনারেল এম. এ. রব ১৯৭৫ সালের ১৪ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।

তাঁর স্মৃতি ও অবদানকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে বানিয়াচংয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ‘মেজর জেনারেল এম. এ. রব স্মৃতি কমপ্লেক্স ও পাঠাগার’। হবিগঞ্জসহ পুরো জাতি মহান মুক্তিযুদ্ধে এই অকুতোভয় সেনাপতির রণকৌশলগত মেধা ও অবদানের কথা চিরদিন গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *